বিশ্বঅলি শাহানশাহ শাহসূফি সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (ক.)’র পবিত্র বার্ষিক ওরশ শরীফ আজ

0
193

আজ মহান ২৬শে আশ্বিন। বিশ্বঅলি শাহানশাহ শাহসূফি সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (ক.)’র পবিত্র বার্ষিক ওরশ শরীফ। সুফী সম্রাট হযরত জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (ক:)’র পবিত্র ওরশ শরীফ আজ। এ উপলক্ষে সুন্নী ঘরানার বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন ছৈয়দ আহমদুল হক মাইজভান্ডারী (ম.জি.আ.) কর্তৃক তাঁরই ফেইসবুক ওয়াল থেকে বর্ণিত বাবাজান ক্বেবলা’র বর্ণাঢ্য জীবনী হুবহু তুলে ধরা হলো।

মহান ২৬শে আশ্বিন স্মরণে বাংলা পৌষ মাস, বঙ্গাব্দ সন ১৩৩৫। চারিদিকে শীত পড়ছে। পৌষের ১০ তারিখ সেদিন৷ ইংরেজি ২৫শে ডিসেম্বর ১৯২৮ সাল। নবিকূলের সরদার নবিবর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র রক্ত, আদর্শ এবং বেলায়তি শক্তির ধারক ও বাহক হয়ে গাউছুল আযম মাইজভান্ডারীর (ক.) পৌত্র সৈয়দ দেলাওয়ার হোসাইন মাইজভান্ডারী ও মওলা রহমান বাবাজান কেবলার(ক.) কন্যা শাহজাদী আম্মাজান সৈয়দা সাজেদা খাতুনের ঘরে জন্ম নেন প্রথম পুত্র। তিন বোনের পর প্রথম পুত্র সন্তানের জন্ম। কিন্তু একি! নবজাতকের কোনো সাড়াশব্দ নেই, নড়াচড়া নেই।

শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ, নাড়িরও সাড়া নেই। শিশু মৃত! সবাই বাকরুদ্ধ! গাউসুল আযম মাইজভান্ডারীর বংশের রাজসন্তানের এমন অবস্থা দেখে মাতা সাহেবানী শুধু একদৃষ্টে ছেলের মুখ চেয়ে আছেন। কেউ কেউ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। করণীয় সম্পর্কে কেউ স্থির করতে পারছেন না। শিশুর বড় নানী সৈয়দা রাবেয়া খাতুন এলেন। বুক ভরা আশা নিয়ে কোলে তুলে নিয়ে গেলেন শিশুর নানার হুজরায়। আবেগি কন্ঠে আবেদন করলেন, ” হযরতের বংশের বাতি নিভে যায় আর আপনি চাদর মুড়ি দিয়ে আরাম করছেন? আপনি না লক্ষ লোকের হাজত রওয়া, মুশকিল কোশা! আপনার সামনে হযরত গাউছুল আযম মাইজভান্ডারীর বংশের বাতি নিভে গেলে তাঁকে কি জবাব দেবেন? হাশরের ময়দানে আল্লাহ ও রসুলকে(দ.) কি করে মুখ দেখাবেন?” শিশুর নানা স্বভাবসুলভ চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন।

আবেদন-নিবেদন শুনেও তিনি নিরুত্তাপ। অবস্থার পরিবর্তন না দেখে এবার শিশুর বড় নানীজান আবেগমাখা জজবায়ী কন্ঠে বললেন, “লক্ষ লক্ষ কাঁটা বিঁধে যখন পাহাড় থেকে এসেছিলেন, আমিই তুলেছিলাম সব কাঁটা। গরম পানিতে রক্ত-পুঁজ ধুয়ে সেবা-শুশ্রুষায় সুস্থ করেছিলাম। প্রতিদান তো কিছুই চাইনি। এখন আমার দাবি এই ছেলের জীবন ফিরিয়ে দিতে হবে।” তীব্র আবেদন শুনে নানাজানও আর চুপ করে রইলেন না। চাদর সরিয়ে ডান হস্ত বাড়ালেন। হাতে পানি পানি ঢালতে হবে। একের পর এক সাত কলসি পানি গড়িয়ে দেন। পানির ধারার নিচে দৌহিত্রকে রাখা হয়। সপ্তম কলসের পানি ঢালা হলে ইশারা দেন থামতে।

তবুও শিশুর কোনো নড়াচড়া নেই। সবশেষ হাত নিংড়ে দু তিন ফোঁটা পানি প্রিয় দৌহিত্রের মুখে দিলেন। চোখ মেললো শিশু৷ ছোট্ট চোখে প্রথমবার দেখা স্রষ্টার সৃষ্টজগত। বড় নানীর চোখে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে যায়। সৃষ্টিকর্তার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন। ধন্য তোমার মহিমা সৃষ্টিরাজ্যের মহারাজ বেলায়তের প্রতাপশালী মাওলানা বাবাজান।

সপ্তম দিবসে ঘটা করে নাম রাখা ও আকিকা অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। নাম রাখা হয় “সৈয়দ বদিউর রহমান”। অনুষ্ঠান শেষ হলে শিশুপুত্রের পিতা হযরত সাহেব কেবলা তাঁর আদরের দেলাময়নাকে বশারতে গম্ভীর কন্ঠে বললেন, “শিশুর নাম রাখুন জিয়াউল হক।” সঙ্গে সঙ্গে পরদিনই পুনরায় অনুষ্ঠান আয়োজন করলেন। দুটি গরু জবেহ করে আদিষ্ট নামটি রাখলেন। জিয়াউল হক শব্দের অর্থ সত্যের আলো। পরম সত্যের প্রকাশ মহিমা হবেন এ শিশু যার কারণে তাঁর প্রপিতামহ হযরত এ নাম রাখলেন।

ধীরে ধীরে শিশু সৈয়দ জিয়াউল হক বড় হতে লাগলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে হযরত গাউছুল আযম মাইজভান্ডারী(ক.) সাহেব কেবলা কাবার পবিত্র হুজরা শরীফে পিতা হতে তাঁর প্রথম পাঠ নেওয়া। এরপর গৃ্হশিক্ষক মৌলভী মোজাম্মেল হকের নিকট থেকে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ। মাইজভান্ডার আহমদিয়া জুনিয়র মাদরাসায়(অধুনালুপ্ত) তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। এরপর ফটিকছড়ি করোনেশান হাই স্কুল সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির পর নানুপুর আবু সোবহান উচ্চ বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন। সেখান অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী কলেজিয়েট হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাশ করেন। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে ১৯৫১ সনে আই.এ পাশ করে উচ্চ শিক্ষার্থে ভর্তি হন কানুনোগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজে। ১৯৫৩ সালে বি.এ টেস্ট পরীক্ষার তৃতীয় দিন আনমনা হয়ে বসে থাকেন। সাদা খাতা জমা দিয়ে বের হয়ে যান।ঠিক এরকমটি করেছিলেন তাঁর নানাজানও। পদ্ধতিগত শিক্ষাপর্বের এখানেই সমাপ্তি। কানুনোগোপাড়া থেকে সোজা হেঁটে মাইজভান্ডার শরীফ চলে আসেন। পবিত্র শরীরের শিরা-উপশিরায় শ্রেষ্ঠ নবি রহমতুল্লিল আলামিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র রক্ত, বেলায়তে ওজমার শ্রেষ্ঠত্বের নির্দিষ্ট দুটি তাজের একটির অধিকারী হযরত গাউছুল আযম মাইজভান্ডারী (ক.) কেবলা কাবার পবিত্র বংশের প্রদীপ তিনি। যুগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বভার তাঁর উপর। তাঁর আধ্যাত্মিক অবস্থার প্রকাশ শুরু।

পুত্র একাধিকবার পিতার নিকট বায়াত গ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। একদা আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের তৎকালীন খতিব ও ইমাম হযরত মাওলানা শফিউর রহমান হাশেমী(র.) সাহেব মাইজভান্ডার দরবারে জিয়ারতে আসেন। তাঁর পিতা অছিয়ে গাউছুল আযম মাইজভান্ডারীর সাক্ষাতে গেলে পুত্রকে বায়াতের সবক পড়িয়ে দিতে বলেন। মাওলানা সাহেবের মন্তব্য, “আপনার মতো বুজুর্গ থাকতে আমার দ্বারা এ কাজ কি ঠিক হবে?” পিতার উত্তর, “আপনি সবকটা পড়িয়ে দিন। বাকি সব আমি করবো।” অতঃপর গাউসে পাকের পবিত্র হুজরায় সবকপাঠ সম্পন্ন হলো।

একদা প্রয়োজনীয় কাজে মাস্টার খায়ের উল বশর সাহেবসহ ঢাকা যাচ্ছিলেন শাহজাদা সৈয়দ জিয়াউল হক সাহেব। পথিমধ্যে মাস্টার সাহেবের নিকট সিগারেট চাইলেন। মাস্টার সাহেব তাঁর অনুজদের পড়ানোসহ দরবারের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত ছিলেন। মাস্টার সাহেবের কাছ থেকে সিগারেট নিয়ে একটি জ্বালিয়ে বাকিগুলো ফের‍ত দিলেন। সিগারেটে কয়েকটি টান দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে আসনে এসে বসলেন। কিছু মানুষ হট্টগোল করতে চাইলেও, বুঝদার এক ব্যক্তির প্রভাবে তাঁরাও চুপে গেলেন। ঢাকা পৌঁছে অস্বাভাবিক ধরণের কথাবার্তা বলতে লাগলেন। “ভাতও খাব না, মিষ্টি খাব” ইত্যাদি। মাস্টার সাহেব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, টাকাপয়সা চাওয়ার আগেই তাঁর নিকট হস্তান্তর করলেন। আঁচ করলেন বড় মিয়া হুজুরের কিছু একটা হয়েছে। এ প্রথম তাঁর অস্বাভাবিক অবস্থা দৃষ্টিগোচর হয়। মাস্টার সাহেব মিষ্টি এনে দিলে না খেয়ে দীর্ঘক্ষণ চেয়ে থাকেন শুধু।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ইস্তফা দিয়ে বাড়িতে আসার পর প্রথমাবস্থায় আনমনা-অন্যমনস্ক হয়ে থাকতেন। খাওয়া দাওয়ার কথা তো দূরেই থাক। সময়ে সময়ে ভাব-বিভোরতা,জজবা হাল উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছুত। ছেলের এ অবস্থা দেখে পিতাকে অনেকে চিকিৎসার পরামর্শ দেন। নানা ধরনের চিকিৎসা করিয়েও ব্যর্থ। নামী এক বৈদ্য এসে পরীক্ষা করে পিতাকে বললেন, “এ রোগ চিকিৎসায় ভালো হবে না। আপনি পাগল করেছেন আপনাকেই ভালো করতে হবে।” প্রত্যুত্তরে পিতা বললেন, “আপনাকে আনলাম চিকিৎসার জন্য আপনি বলছেন অন্য কথা!” ২৫০ টাকা ফিস দিলে তিনি ২৫ টাকা যাতায়াত খরচ নিয়ে বিদেয় নিলেন।

ঐশী প্রেরণা তুঙ্গে পৌঁছালে আহার-নিদ্রা একেবারেই ত্যাগ দিলেন। কয়দিনের মাথায় সবকিছু ভুলে আছেন আপন হালতে। মাথায় ঢালা হলো পানির পর পানি। তাও কোনো ফল হলো না। পুত্রের এমন অস্বাভাবিক অবস্থায় পিতা একরাত্রে কিছুটা চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় বিশ্রামে নিচ্ছিলেন। দেখছেন দাদা গাউছুস ছামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বিন পাশে এসে বলছেন, ” আপনি এত চিন্তিত হচ্ছেন কেন? আমার হরিণ রঙের ক’বা অর্থাৎ জুব্বাটা তাঁর গায়ে পড়িয়ে দিন।” যথানিয়মে রওজা শরীফ সংলগ্ন স্মৃতিঘর থেকে উক্ত জুব্বা এনে ছেলের গায়ে দিয়ে তিনি আপন হুজরায় গমন করেন। তন্দ্রাচ্ছন্ন হতেই লক্ষ্য করেন কে যেন হুজরার দরজা খুলতে চাচ্ছে। উঠে দেখলেন বড় শাহজাদা সৈয়দ জিয়াউল হক মিয়া। তিনি গিয়ে পিতার পার্শ্বে শয়ন করলেন। এক ঘুমে পরদিন সন্ধ্যা। স্নান ও আহার শেষে পুনরায় সারারত হয়ে পরদিন সকাল ৯টা অব্দি ঘুম৷ এরপর কিছুদিন শান্ত ও স্বাভাবিক অবস্থায় রইলেন। ক’দিন পর আবার বিভোরতা চলে আসে।

একদিন হযরত সাহেব কেবলা কাবার পবিত্র রওজা পাকে জিকির মাহফিল চলছিলো। জিকির শেষ হলে সকলে রওজা অভিমুখে তাজিমে লুটিয়ে পড়লেন। ঠিক সে সময় তিনি রওজা পাকে উপস্থিত হলেন। ভেতরে ঢুকে যাকে সামনে পেলেন মারতে লাগলেন। যে যেভাবে সুযোগ পেয়েছেন পালিয়েছেন। ছুটে গিয়ে পিতার নিকট বড় শাহজাদা মিয়া হুজুরের ব্যাপারটি ব্যক্ত করলেন। পিতা পুত্রকে হুজরায় ডাকালেন। হুজরার সকল দরজা-জানালা বন্ধ করে পিতা পুত্র মুখোমুখি।
পুত্রের প্রশ্ন, “হযরত কেবলা কে? বাবাজান কেবলা কে?”
পিতা উত্তর দিলেন, “আল্লাহর অলি দুয়ে মিলে এক ”
পুত্রের পুনঃ জিজ্ঞাসা,” আপনি কে?”
পিতার উত্তর, “আমি হযরতের অছি এবং বাবাজান কেবলার ফয়েজপ্রাপ্ত। তাঁরা আমার মধ্যে আছেন। ”
এরপর পুত্র কি একটা যেন জিজ্ঞাসা করতেই(অশ্রুত) পিতা উচ্চ আওয়াজে রাগতস্বরে বলছেন, “আমাকে এখনো চিন নাই? আমি কে তা কি দেখবে?”
খানিককাল কেটে গেলো নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ, পিনপতন নীরবতা। দরজা খুলতেই উপস্থিতিবৃন্দ দেখলেন পিতার মুখমন্ডল রক্তিম আর পুত্র দু হস্তে ভর দিয়ে মুখ নিচু করে বসে আছেন। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে বেশ ভীত। লালা ঝড়ছে। তাঁকে ভেতর বাড়িতে নিয়ে যেতে খাদেমদের নির্দেশ দিলেন। ভেতরে নিয়ে মাথায় পানি ঢালা হলো। অনেকক্ষণ পর স্বাভাবিক হলেন। তবে রাতে ঘুম নেই। এ ঘর ছুটেন ও ঘর ছুটেন। হুজরায় গিয়ে পিতাকে পুনঃপুনঃ ডাকতে থাকেন। স্নেহভরা কন্ঠে বললেন,”ঘুমুতে যাও।”

পরদিন বিকালে হযরত গাউছুল আযম মাইজভান্ডারী (ক.) কেবলায়ে আলমের রওজা পাকে তাজিমে লুটিয়ে পড়েন। সময় হিসেবে প্রায় দু ঘন্টা অতিবাহিত হয়ে গেলো। উঠবার কোনো লক্ষণ নেই। খাদেমদের প্রতি পিতার নির্দেশ, “উঠিয়ে দোকানের চেয়ারে বসিয়ে দাও।” চেয়ারে বসলে ঢলে পড়তে দেখে দুজন খাদেম সাহেব অফিস কক্ষে এনে শুইয়ে দেন। খবর পেয়ে ভেতর বাড়িতে তাঁর আম্মাজানসহ অন্যান্যরা কাঁদতে লাগলেন। অফিসের সামনে বহু মানুষ জমে গেলো। সন্তানের এ অবস্থায় পিতাও অঝোরে কাঁদতে থাকেন। উপস্থিতিবৃন্দও চোখে পানি ধরে রাখতে পারছেন না রাজদুলালের এ অবস্থা দেখে। পিতা বলতে লাগলেন,” আমাকে পুনঃপুনঃ প্রশ্ন করাতে মন একটু গরম হয়। যে শক্তি আমি তার উপর ঢেলেছি মণির পাহাড়ে(পার্বত্য চট্টগ্রাম) ঢাললে সে পাহাড় ঢলে যেত। সাগরে দিলে সাগর জলশূন্য মরুভূমি হয়ে যেত। আমার রক্তের বাণ(উত্তরাধিকারী) বলে এখনো টিকে আছে।”

সারারাত ধরে পানি দেওয়া হয়। সকালে হুঁশ ফিরলে মাকে জানান “মা আমার সিনা(বক্ষ) জ্বলে পুড়ে একেবারে কয়লা হয়ে গেছে।” হযরতের স্থলাভিষিক্ত পিতা এভাবে তাঁর সিনা চাক বা বক্ষ বিদারণ করেন। ঐশী জ্ঞান ধারণের জন্য এভাবে নবি ও অলিদের সিনা চাক করা হয়। ওহী অবতরণের পূর্বে ফেরেশতা জিব্রাইল(আ.), আল্লাহর নবি(দ.)’কে আলিঙ্গনপূর্বক সিনা চাক করেন।

পৌষ-মাঘে গ্রাম বাংলার অবস্থার বর্ণনা করে অনুভব করানোটা বেশ দুরূহ ব্যাপার। কাঁথা-কম্বল এ সময়গুলোর নিত্য সম্বল। কখনোবা শীতের তীব্রতায় কাঁথা,লেপ,কম্বলের ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়৷ এমন তীব্র ঠান্ডার মধ্যেও বাড়ির পুকুরে কয়েক ঘন্টা কিংবা একটানা কদিনও ডুবে থাকতেন সৈয়দ জিয়াউল হক শাহ। বাড়ির পশ্চিমে লোহার খাল। খালটি ছায়াঢাকা। দিন দুপুরেও খালের পানি বেশ ঠান্ডা থাকতো, যার দরুণ দিনে দুপুরেও সে খালে কেউ নামতে চাইতো না। তিনি শুধু নাকখানা উপরে রেখে ডুবে থাকতেন সে খালে। ঠান্ডার তীব্রতায় গাত্রবর্ণ ফ্যাকাসে সাদা হয়ে যেতো। পর পর কয়েকটি শীতকালে তিনি এরকমভাবে থেকেছেন। একদিন বিকেলবেলা রাস্তা অভিমুখে হাঁটতে লাগলেন। একজন খাদেমকে পিতা একটু ঘুরিয়ে আনতে বললেন। বড় রাস্তা ধরে সোজা পশ্চিমমুখী হয়ে যেতে লাগলেন। বাড়ি যেতে বললে বলেন আজিমনগর গিয়ে ফিরবেন।

তাঁর রহস্যপূর্ণ বাক্যে থাকতো আত্ম উন্নতির বীজ। যেমন সকলের উদ্দেশ্যে বলেছেন,”হালাল খাও,নামাজ পড়, আল্লাহ আল্লাহ জিকির কর। সব সমস্যা মিটে যাবে।” হাদীয়া নজরানার অর্থ অনেকসময় পুড়ে ফেলতেন। বলেছেন, “সব টাকা ভালো নয় তাই পুড়তে হয়।”

জাতি,ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের জন্য উন্মুক্ত ছিলো তাঁর করুণাধারা। বলেছেন, “ধনী গরীব কোনো কথা নয়। সবাই মানুষ, মানুষে মানুষে প্রীতিভাব থাকা প্রয়োজন।” “আমার দরবার প্রাচ্যের বায়তুল মোকাদ্দাস, আল্লাহর ঘর সকল জাতির মিলনকেন্দ্র।” সম্প্রীতির ডোরে বন্ধন সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে চেতনার উদ্দীপক তাঁর মহান বাণী,” দরবারে হিন্দু মুসলমান কোনো ভেদাভেদ নাই।সব এক আল্লাহর সৃষ্টি।”

বাহ্যিকতার অন্তরালের মূল দৃশ্যে বিশ্বঅলির কর্ম যারা দেখেছেন তাঁরা সকলেই সাক্ষ্য দিয়েছেন তাঁর প্রকৃতাবস্থা সম্পর্কে। লক্ষ্য অর্জনে প্রান্তে গিয়ে হেলে পড়া সাধকদের পূর্ণতা দিয়ে তাঁকে অলি আল্লাহর পদে অধিষ্ঠিত করতেন শাহানশাহ হক ভান্ডারী। তাঁর এমন করুণাকর্ম ছিলো সকল স্তরের সাধকদের জন্যই। তিনি ছিলেন কালের মহান মোজাদ্দেদ অর্থাৎ যুগ সংস্কারক। তাঁর নানাজান হযরত গাউছুল আযম বাবা ভান্ডারীর(ক.) ফয়েজপ্রাপ্ত অলি আল্লাহ হযরত আব্দুল কুদ্দুছ শাহ মাইজভান্ডারী(ক.) বহুবার বলেছেন, ” বংশগত পবিত্রতা ও অসাধারণ ইবাদত রেয়াজতে আমার মামু সাহেব হযরত জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী আল্লাহর এমন নৈকট্য লাভ করেছেন যেখানে আগামী এক হাজার বছরে অন্য কাউকে দেখা যাচ্ছেনা।

নিঃসন্দেহে তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অলি।” অলিয়ে কামেল হাফেজ মাওলানা বজলুর রহমান সাহেব(র.) এর খলিফা হযরত মাওলানা শামসুদ্দীন আহমদ চাটগামী বলেন,”শাহানশাহ হক ভান্ডারী এমন এক উচ্চ মর্যাদার অলি আল্লাহ যার ইচ্ছার উপর যুগের অন্য কামেল অলিদের ভালোমন্দ নির্ভরশীল। তাঁর বেলায়তি দপ্তরের এমন ক্ষমতা যে,যে কোন চোরকে তিনি মুহূর্তে আবদাল বানাতে পারেন।” গোমদন্ডী দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন হযরত শাহসূফি সৈয়দ আবুল হাশেম শাহ মাইজভান্ডারী(ম.) সাহেব তাঁর রচিত কালামে উল্লেখ করেন,

“জিয়া মওলা মাইজভান্ডারী ভবের কর্ণধার,
আল্লাহর কুদরতে তিনি আউলিয়ার সর্দার।
খতম করি গাউছিয়ত, জারি করে মাবুদিয়ত,
হাতে নিয়া বেলায়ত, যুগের সর্দার।”

আরেক কালামে উল্লেখ করেন,
“কি বলিব শান আমি বাবা মাওলানার
শাহানশাহ জিয়া মওলা পাবি নারে আর।।
যুগের প্রবর্ত্তক তিনি
সময় থাকতে লওরে ছিনি
বিনা মূল্যে লওরে কিনি
প্রেমের বাহার।।
বলে মোজাদ্দেদ আলফেসানী
সাত শত বছর পর আসবেন যিনি
মোজাদ্দেদ হইবেন তিনি
হুকুম আল্লাহর।।
কার্যকলাপ হুবুহু
শানে জল্লে জালালুহু
গাউসুল আযম রুবারুহু
পরিচয় তাহার।।”

কর্মকর্তৃত্বের ব্যাপারে বিশ্বঅলি নিজেই বলেছেন “আমার দরবার আন্তর্জাতিক সামরিক আইন প্রশাসন অফিস।দুনিয়ার সবকিছু আমি ভেঙেচুরে ঠিক করি।” “আমার দরবার আন্তর্জাতিক প্রশাসন অফিস, যেখান থেকে এই বিশ্ব পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত।”

সমগ্র বিশ্ব তাঁর করুণাধারায় অবিরত সিক্ত হয়েছে এবং মহাপ্রলয় পর্যন্ত এ করুণাধারা অবিরত ঝরতে থাকবে। তিনি বলেছেন, “রহমতুল্লিল আলামিন রসুলের(দ.) রহমতের সীমানা জুড়ে আমার বেলায়তি কর্মক্ষমতা।”

তাঁর প্রতিটি কর্মই ছিলো রহস্যাবৃত। তাঁর পবিত্র জাহেরি জীবদ্দশায় প্রতি মুহূর্তেই অলৌকিক ঘটনা দৃশ্য হতো। যেগুলো বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। মহাশক্তির আধার তিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতে তাঁর কর্তৃত্ব কার্যক্রম। মহাশক্তির ধারক ও প্রকাশ শাহানশাহ ত্রিজগতের মহান সম্রাট৷ এ মহান সত্ত্বাকে বুঝে উঠেও বোঝা যেতনা। ধরাছোঁয়ার বাইরে, বোধজ্ঞানের অতীত এক রহস্যময় মহাপুরুষ।

সৃষ্টিকর্তার মহান দায়িত্ব সমাপন করে বাংলা আশ্বিন মাসের ২৬ তারিখ, ইংরেজি ১৯৮৮ সনে “আল্লাহ আল্লাহ ” জিকিরের সঙ্গে ইহজগত হতে পর্দা করে মহান একক সত্ত্বার পবিত্র অস্তিত্বে মিলিত হন। ওফাতের সময় উত্তরাধিকারী হিসেবে রেখে যান একজন পুত্র শাহজাদা এবং ৫ জন কন্যা শাহজাদীকে। একমাত্র পুত্র হযরত শাহসূফি সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভান্ডারী(ম.)’কে মস্ত বড় অলি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়ে যান।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে পুত্রের অবস্থান সম্পর্কে অসংখ্য কালাম করেন।