বীর মুক্তিযোদ্ধা লে. সেলিমের শাহাদাত বার্ষিকী আজ

0
147

বিশেষ প্রতিনিধি: বীর মুক্তিযোদ্ধা লে. সেলিম মো. কামরুল হাসানের ৪৯তম শাহাদাত বার্ষিকী আজ। ১৯৭২ সালের আজকের এই দিনে রাজধানীর মিরপুরকে মুক্ত করতে গিয়ে ৪১ জন সেনা, শতাধিক পুলিশ সদস্যসহ লে. সেলিম শাহাদাতবরণ করেন। 

১৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দেশ স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় লাভ করলে ৯ মাসের অপরিসীম আত্মত্যাগ ও কষ্টের ফল দেখতে পান। নিজের প্রিয়জনদের কাছে ফিরে আসেন সেলিম। বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতির প্রথম গার্ড কমান্ডার নিযুক্ত হন তিনি।

যুদ্ধে বিজয় লাভের এক মাস পরও মিরপুর ১২ নম্বর সেক্টরের ৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকা পাকিস্তানি দোসরদের ঘাঁটি হিসেবে অবরুদ্ধ ছিল। রাজাকার, আলবদর, বিহারী ও কিছু পাকিস্তানি সেনাদের সমন্বয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ঘাঁটি গেড়ে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করে অবস্থান করছিলো শত্রুপক্ষ।

যুদ্ধ চুক্তি ভেঙ্গে বাংলাদেশিদের উপর নির্বিচারে খুন, লুণ্ঠন, অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছিল পরাজিত দোসর দল। বিজয়ের ৪৫ দিন পর ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অবরুদ্ধ মিরপুর মুক্তকরণ অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। লে. সেলিম, ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদ, ডিএসপি লোদীসহ ৩০০ জন পুলিশ এবং ১৪০ জন সৈনিক ৩০ জানুয়ারি সকালে মিরপুর প্রবেশ করেন।

সেদিন সকাল ১১ টায় লে. সেলিম যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছানোর পরপরই গুলি শুরু হয়। গোলাগুলির এক পর্যায়ে লে. সেলিমের বুকে একটি গুলি লাগে। সহকর্মীরা তাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গেলে জ্ঞান ফিরে পেয়ে নিজের শার্ট খুলে বুকে বেঁধে নেন নিজেই। দিশেহারা সহকর্মীদের সাহস দিয়ে তিনি বলেন “আমি বেঁচে থাকতে তোমাদের ছেড়ে যাচ্ছি না।”

গুলিবিদ্ধ দেহ নিয়েই লে. সেলিম সিংহের মতো লড়াই করে যান যুদ্ধের ময়দানে। যুদ্ধ করতে করতে তার পাশেই শহীদ হন অসংখ্য সহযোদ্ধা। তবু মনোবল হারাননি তিনি। সারাদিন গোলাগুলির পর বিকেলের দিকে জীবিত যোদ্ধাদের নিয়ে কালাপানির ঢলের কাছে এসে দাঁড়ান।

অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ আর পরিশ্রমে ফ্যাকাসে ও ক্লান্ত হয়ে উঠেছিল তাঁর দেহ। বুকের ক্ষত নিয়ে নিজে পানিতে না নামলেও সহযোগীদের উৎসাহ দিয়ে বিল পার করান। গাছের আড়ালে থেকে শত্রুসেনাদের বিপক্ষে কভার ফায়ার করে সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন তিনি।

এরপর হয়ত সহকর্মীদের সাহায্যের আশায় বুক বেঁধেছিলেন লে. সেলিম। জীবনের শেষ সম্ভাবনাটুকু বাঁচিয়ে রাখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন শীর্ণ প্রাণ নিয়ে। মেঘে ঢাকা সেই জ্যোৎস্না রাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার সময়ও কোনো সাহায্য পান নি আত্মত্যাগী এই যোদ্ধা। ৩১ জানুয়ারি শত্রুর কবল থেকে মিরপুর মুক্ত ঘোষিত হওয়ার পরও লে. সেলিমের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি কোথাও।

১৯৯৯ সালে মিরপুর মুসলিমবাজার বদ্ধভূমি আবিষ্কারের পর কিছু দেহাবশেষ খুঁজে পাওয়া গেলেও সেখানে লে. সেলিমের অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় তার স্মৃতি রক্ষার্থে প্রতিষ্ঠিত রাজধানীর মধুবাগের শহীদ লে. সেলিম শিক্ষালয়ের উদ্যোগে পালন করা হবে। এ উপলক্ষে আজ স্কুলের মূল ভবনে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া দিনটি উপলক্ষে কোরআনখানি এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে শহীদের কবরে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।

আজ শহীদ লে. সেলিম শিক্ষালয় প্রাঙ্গণে আলোচনা সভা, দুরুদ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে শহীদের রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করার জন্য স্কুলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন শিক্ষালয়ের প্রধান শিক্ষয়িত্রী সুলতানা রাজিয়া হোসেন ও অধ্যক্ষ আফতাব হোসেন সিকদার।